Notification texts go here Contact Us Buy Now!

ভূমিকম্প কেন হয় এবং ভূমিকম্পের সময় করণীয় কী?

Md Nafiul Haque

ভূমিকম্প শব্দটার সাথে আমরা সবাই পরিচিত। বলতে গেলে বেশ ভয়ানক ভাবেই পরিচিত। এইতো কয়েকঘন্টা আগে  সিলেটে কয়েক মিনিটের ভিতরে ৭ বার ভূমিকম্প অনূভুত হয়েছে।  কিন্তু ভূমিকম্প কেন হয় তা কি আমরা জানি? আমরা অধিকাংশই জানি না। তাহলে চলুন আজ জেনে নেয়া যাক ভূমিকম্প হওয়ার পেছনে কারণ, কখনো কখনো দেশের কোনো একপ্রান্তে ভূমিকম্প হলেও সারাদেশে কেন হয় না?  এবং ভূমিকম্প বিষয়ক আরো কিছু তথ্য।


ভূমিকম্প কী?

১৯১২ সালে জার্মান বিজ্ঞানী আলফ্রেড ওয়েগনার  বিভিন্ন গবেষণা  করে একটি  তত্ত্ব প্রকাশ করেন। তত্ত্বটির নাম হল “কন্টিনেন্টাল ড্রিফট” । এ তত্ত্ব অনুসারে, এক সময় পৃথিবীর মহাদেশ গুলো একসাথে ছিলো। কিন্তু পরে তা বিভক্ত হয়ে একে অপর থেকে দূরে সরে গেছে। আমদের পৃথিবীর ভূ পৃষ্ঠ অনেক গুলো খন্ড বা  প্লেটে বিভক্ত। এই প্লেট গুলোকে বলা হয় “টেকটনিক প্লেট”।  এই প্লেট গুলো একে অপরের সাথে পাশাপাশি অবস্থান করে। কিন্তু এরা স্থির নয়। এরা একে অপরের সাপেক্ষে কখনো কাছাকাছি আসে। কখনো কখনো দূরে সরে যায় আবার কখনো কখনো নিজেদের মাঝে সংঘর্ষ হয়। বিপুল পরিমাণে শক্তি বহন করা দুটি টেকটনিক প্লেট যখন একে অপরের সাথে ধাক্কা খায় তখন এ শক্তি বাইরে নির্গত হয় যা পৃথিবীর উপরিভাগকে কাঁপিয়ে দেয়। কম্পন আকারে এ শক্তি মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে তখনি ভূমিকম্প হয়।
 
যেখানে টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থল  আছে সেখানটাকে বলা হয়ে থাকে “ফল্ট লাইন”। আর এ ফল্ট লাইনেই ভূমিকম্প বেশি হয়। ফল্ট লাইনের বিচ্যুতির ফলে যে শক্তি নির্গত হয় তা সিসমিক তরঙ্গ রূপে মাটির ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সব দিকে ছড়িয়ে পড়ে। যে কেন্দ্রে ভূমিকম্প উৎপন্ন হয় তাকে হাইপোসেন্টার (Hypocenter) বলে। আর তার ঠিক উপরে ভূপৃষ্ঠে অবস্থিত বিন্দুটিকে বলা হয় এপিসেন্টার (Epicenter) উৎপত্তিস্থলে ভূমিকম্পের তীব্রতা থাকে সবচেয়ে বেশি।

ভূমিকম্প যখন সৃষ্টি হয় তখন তিন ধরণের তরঙ্গ বা ওয়েভের সৃষ্টি হয়। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলে যে ওয়েভ সৃষ্টি হয় তাকে বলা হয় প্রাইমারি ওয়েভ বা P wave. এটি সবচেয়ে দ্রুত গতিতে আশে পাশে ছড়িয়ে পড়ে। এর পর দ্বিতীয় একটি ওয়েভের সৃষ্টি হয় যাকে বলে সেকেন্ডারি ওয়েভ বা S wave.  তৃতীয় ওয়েভটির নাম হল সার্ফেস ওয়েভ। এই সার্ফেস ওয়েভটিই ভূপৃষ্ঠে এসে আঘাত হানে। আর তখনি আমরা ভূমিকম্প অনুভব করতে পারি।

সারা পৃথিবীতে বছরে প্রায় ছয় হাজার ভূমিকম্প হয়। এর বেশির ভাগের পেছনেই দায়ী হয় ফল্ট লাইনের এদিক সেদিক হওয়া। তবে এটি ছাড়াও আরো কিছু কারণ আছে।  যেমন আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের ফলে ভূমিকম্প হয়ে পারে। এ ছাড়াও নিউক্লীয় বোমার বিস্ফোরণের ফলেও ভূমিকম্প হতে পারে।

৯ বা তার বেশি কম্পন হলে ভয়ঙ্কর ক্ষয়ক্ষতি হয়৷ সমুদ্র কাছে থাকলে সুনামিও হতে পারে৷

বাংলাদেশে ভূমিকম্পের অবস্থা:

আমাদের বাংলাদেশ “ভারতীয়, ইউরশিয় এবং মায়ানমার” টেকটনিক প্লেটের মাঝে আবদ্ধ। এই প্লেট সমূহের নড়াচড়ার  কারণে প্রায়ই  দেশে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিকগণ বাংলাদেশের মাঝে চারটি ফল্ট লাইন চিহ্নিত করেছেন সেগুলো হলঃ

১। ডাউকি ফল্ট, যা ভূমির উপরে সিলেট-জৈন্তাপুর/ মেঘালয় বর্ডারে বাংলাদেশের পূর্ব থেকে পশ্চিম বরাবর এবং মাটির গহ্বরে শিলং প্লাটু বরাবর ৩০০ কিমি ধরে চলে গেছে।

২। ১৫০ কিমি দীর্ঘ মধুপুর ফল্ট , যা  উত্তর থেকে দক্ষিণে মধুপুর  থেকে যমুনায় নদী পর্যন্ত বিস্তৃত।

৩। আসাম সিলেট ফল্ট যা উত্তর পূর্ব থেকে দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থান করছে ।

৪। চিটাগাং মিয়ানমার প্লেট বাউন্ডারি যা চট্টগ্রাম এবং মিয়ানমারের সমুদ্রতট ধরে ৮০০ কিমি উত্তর দক্ষিণে অবস্থান  করছে।

এই ফল্টলাইনের উপস্থিতি বাংলাদেশে  ভূমিকম্প হওয়ার জন্য দায়ী। বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চলে মাঝে পড়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের নিচ দিয়ে টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থল গিয়েছে। এই প্লেটের নড়াচড়ার কারণে বাংলাদেশ প্রতি এক হাজার বছরে তিন থেকে পনের মিটার করে সংকুচিত হচ্ছে। যার ফলে ভূ অভ্যন্তরে বিশাল পরিমাণ শক্তি জমা হচ্ছে। যার কারণে  জমে থাকা এ শক্তি যে কোনো সময় বিশাল বড় ভূমিকম্প আকারে বেড়িয়ে আসতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।

ভূমিকম্পের সময় করণীয়:

ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেয়ার কোনো প্রযুক্তি এখন পর্যন্ত সেভাবে আলোর মুখ দেখেনি বলে সচেতনতাই আমাদের এক মাত্র সমাধান। যে কথাটি সবার আগে প্রয়োজন সেটা হল তাড়াহুড়া করতে গিয়ে বিপদে পড়া বা অন্যকে বিপদে ফেলা যাবে না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে , ভূমিকম্প হয়েছে একেবারেই মৃদু কিন্তু মানুষ আতংকিত হয় দ্রুত বিল্ডিং থেকে বের হতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে। এমনটা যাতে না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এছাড়াও অন্যান্য যে করণীয় কাজ গুলো হয় তা নিম্নরূপ:

১। ভূকম্পন অনুভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসার বিদ্যুৎ ও গ্যাসলাইন বন্ধ করে ফেলুন।

২। বাসা থেকে বের হয়ে পড়ুন। আর সম্ভব না হলে তখনই মজবুত টেবিল, খাটের নীচে কিংবা পিলারের সঙ্গে অবস্থান করুন।হাঁটু ও হাতের ওপর ভর দিয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ুন।   মাথা রক্ষার জন্য বালিশ হাতের কাছে রাখতে পারেন।

৩। বের হওয়ার সময় লিফট ব্যবহার না করাই ভালো। বিদ্যুৎ চলে যেতে পারে। তখন ঘটতে পারে দুর্ঘটনা।

৪। বিভিন্ন রকমের পতনশীল ভারি আসবাব, ছবির ফ্রেম, আয়না, জানালা থেকে দূরে থাকুন।

৫।  আগুন জ্বালাবেন না। গ্যাস লাইন লিক করে থাকলে তা থেকে  আগ্নিকান্ড হতে  পারে।

৬। গাড়িতে থাকলে যথাসম্ভব নিরাপদ স্থানে থাকুন। আশপাশে বড় ভবন নেই এমন জায়গায় গাড়ি পার্ক করতে পারেন। কখনো সেতুর ওপর গাড়ি থামাবেন না।

৭। টাকা বা অলঙ্কারের মতো কোনো কিছু সঙ্গে নেওয়ার জন্য অযথা সময় নষ্ট করবেন না।

৮।  বিল্ডিং কোড মেনে বিল্ডিং নির্মাণ করুন।

পরিশেষে বলা যায় ভূমিকম্পকে মোকাবেলা করার মত প্রযুক্তি এখনো আমাদের  হাতে নেই । কিন্তু আমরা যদি নিয়ম মেনে আমাদের নগর গড়ে তুলি এবং সতর্কতামূলক  এসব নির্দেশিকা মেনে চলি তাহলে  ক্ষতির হাত থেকে  অনেকটাই রক্ষা করতে পারবো নিজেদের।



Post a Comment

Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.